Logo

ক্ষমতা কি মানুষকে বদলায়, নাকি মানুষ আসলে এমনই ছিল?

যুদ্ধ শুরু হলে আমরা সাধারণত অস্ত্র, সীমান্ত আর সেনাবাহিনী দেখি।
কিন্তু যুদ্ধের ভেতরে আরেকটা জিনিস খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ক্ষমতা

ক্ষমতা যখন হাতে আসে, তখন মানুষ কী করে?
সে কি বদলে যায়, নাকি তার ভেতরে যা ছিল, সেটাই শুধু প্রকাশ পায়?

ইতিহাসে প্রায় সব যুদ্ধের পেছনে একটা না একটা রাজনীতি থাকে।
রাজনীতি কখনো নিরাপত্তার কথা বলে, কখনো আদর্শের কথা বলে, কখনো প্রতিশোধের কথা বলে।
কিন্তু যুদ্ধের মাটিতে দাঁড়িয়ে যারা মরছে, তাদের কাছে রাজনীতি খুব দূরের একটা শব্দ।

ক্ষমতার টেবিলে সিদ্ধান্ত হয়।
মাঠে তার ফল ভোগ করে মানুষ।

আমরা প্রায়ই বলি—
“ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয়।”

কিন্তু আরেকটা প্রশ্নও আছে—
ক্ষমতা কি সত্যিই মানুষকে বদলায়,
নাকি ক্ষমতা শুধু মানুষটাকে খুলে দেখায়?

কারণ যখন কারও হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি থাকে না,
তখন তার নৈতিকতা পরীক্ষা হয় না।

কিন্তু যখন তার হাতে থাকে সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র, ক্ষমতা—
তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত হয়ে যায় রাজনীতি

যুদ্ধের সময় এটা আরও স্পষ্ট হয়।

একজন নেতা হয়তো বলছেন এটা প্রয়োজনীয়।
আরেকজন বলছেন এটা আত্মরক্ষা।
কেউ বলছেন এটা প্রতিশোধ।
সবাই নিজের অবস্থানকে রাজনীতির ভাষায় ব্যাখ্যা করেন।

কিন্তু রাজনীতির ভাষা আর মানুষের বাস্তবতা সব সময় এক না।

একটা সিদ্ধান্ত কাগজে হয়তো কৌশল।
কিন্তু সেই একই সিদ্ধান্ত কারও জীবনে হয়ে যায় ক্ষতি, ভয়, বা শোক।

এটাই ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সত্য—
ক্ষমতা যত বড় হয়, তার প্রভাব তত দূরে পৌঁছায়।

রাজনীতি সব সময় খারাপ না।
রাজনীতি দরকার—কারণ রাষ্ট্র চালাতে সিদ্ধান্ত লাগে।

কিন্তু সমস্যা তখন হয়
যখন রাজনীতি মানুষের চেয়ে বড় হয়ে যায়।

যখন ক্ষমতা ধরে রাখাই হয়ে ওঠে লক্ষ্য,
আর মানুষের জীবন হয়ে যায় কেবল পরিসংখ্যান।

তখন প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে—

ক্ষমতা কি মানুষকে বদলায়?
নাকি মানুষ আসলে এমনই ছিল,
শুধু ক্ষমতা তাকে প্রকাশ করার সুযোগ দিয়েছে?

যুদ্ধের সময় এই প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
কারণ তখন রাজনীতি শুধু বিতর্ক না—
তা হয়ে ওঠে জীবনের সিদ্ধান্ত।

শেষ প্রশ্নটা তোমার জন্য—

যখন একজন মানুষ ক্ষমতায় যায়,
সে কি বদলে যায়?
নাকি আমরা তখন প্রথমবার তাকে আসল রূপে দেখি?

নতুন বই: অস্তিত্বের সংকট

Rakibul Hasan Shawon

অস্তিত্বের সংকট

নিউজফিড কি আমাদের মনকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে?

আমরা ভাবি আমরা স্ক্রল করছি।
হয়তো সত্যটা উল্টো—
স্ক্রল আমাদের করছে।

প্রতিদিন সকালে চোখ খোলার আগে
আমরা ফোন খুলে ফেলি।
নিউজ। রিল। মতামত। ক্ষোভ। ট্রেন্ড।
সব একসাথে ঢুকে যায় মাথার ভেতর।

আমরা মনে করি আমরা তথ্য নিচ্ছি।
আসলে আমরা অভ্যাস বানাচ্ছি।

নিউজফিড আমাদের কী শেখায়?

দ্রুত রাগ করতে।
দ্রুত বিচার করতে।
দ্রুত পক্ষ নিতে।
আর দ্রুত ভুলে যেতে।

কোনো খবর ২৪ ঘণ্টার বেশি বাঁচে না।
কোনো ক্ষোভ ৪৮ ঘণ্টার বেশি টেকে না।
নতুন কিছু এলে পুরোনোটা মুছে যায়।

আমাদের মনও কি তেমন হয়ে যাচ্ছে?

ধীরে ভাবার ক্ষমতা কমছে।
গভীর পড়ার ধৈর্য কমছে।
শুধু শিরোনাম দেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।

অ্যালগরিদম জানে তুমি কীতে থামো।
কোন ভিডিওতে তুমি বেশি সময় দাও।
কোন পোস্টে তুমি রেগে যাও।
কোন মতামতে তুমি উত্তেজিত হও।

তারপর সে তোমাকে আরো সেটাই দেয়।

তুমি ভাবো—
“সবাই তো এমনই ভাবছে।”

আসলে “সবাই” না।
শুধু তোমার মতো যারা ভাবছে,
তাদেরকেই তুমি বেশি দেখছো।

ধীরে ধীরে তোমার দুনিয়া ছোট হয়।
তোমার মতামত শক্ত হয়।
তোমার সন্দেহ কমে যায়।
আর তোমার নিশ্চিততা বাড়ে।

কিন্তু নিশ্চিততা সব সময় সত্য না।
কখনো কখনো সেটা পুনরাবৃত্তির ফল।

নিউজফিড শুধু খবর দেয় না।
সে আমাদের মনকে রিফ্লেক্স শেখায়।

দেখা → রাগ
দেখা → সমর্থন
দেখা → শেয়ার
দেখা → ভুলে যাওয়া

আমরা কি নিজের চিন্তা করছি,
নাকি প্রশিক্ষিত প্রতিক্রিয়া দিচ্ছি?

সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপারটা হলো—
এই প্রশিক্ষণটা নীরব।
ধীরে ধীরে হয়।
আমরা টেরও পাই না।

হয়তো নিউজফিড খারাপ না।
হয়তো সমস্যা এটা না যে আমরা দেখি—
সমস্যা হলো আমরা থামি না।

আজ একটা প্রশ্ন রেখে যাই—

তুমি যখন স্ক্রল করো,
তুমি কি বেছে নিচ্ছো?
নাকি তোমাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে?

নিরপেক্ষ থাকা কি সত্যিই নির্দোষ থাকা?

আমরা প্রায়ই বলি—
“আমি রাজনীতিতে নেই।”
“আমি কোনো পক্ষ নেই।”
“আমি নিরপেক্ষ।”

শুনতে খুব শান্ত, খুব ভদ্র একটা অবস্থান।

কিন্তু প্রশ্নটা হলো—
নিরপেক্ষ থাকা মানে কি সত্যিই নির্দোষ থাকা?

ধরো, কোনো অন্যায় তোমার সামনে হচ্ছে।
তুমি কিছু বললে না।
কিছু করলে না।
কোনো পক্ষ নিলে না।

তুমি কি নির্দোষ?
নাকি তুমি শুধু নিরাপদ?

অনেক সময় নিরপেক্ষতা নীতির না, ভয়ের জায়গা থেকে আসে।
আমরা ঝামেলা চাই না।
সমালোচনা চাই না।
বন্ধু হারাতে চাই না।

তাই আমরা বলি—
“আমি কিছু জানি না।”
“আমি এসব নিয়ে কথা বলি না।”

কিন্তু ইতিহাসে খুব কম অন্যায় থেমেছে
কারণ মানুষ নিরপেক্ষ ছিল।

অন্যায় টিকে থাকে তখনই,
যখন ভালো মানুষ চুপ থাকে।

আবার এটাও সত্য—
সব বিষয়েই চিৎকার করা বুদ্ধিমানের কাজ না।
সব লড়াই আমাদের না।
সব মতামত দেওয়াও প্রয়োজন না।

তাহলে সীমারেখাটা কোথায়?

সমস্যা তখনই শুরু হয়
যখন নিরপেক্ষতা হয়ে যায় অভ্যাস।
যখন আমরা আর বিবেকের প্রশ্ন শুনি না,
শুধু নিরাপত্তার হিসাব করি।

নিরপেক্ষতা কখনো কখনো জ্ঞানী অবস্থান।
কিন্তু অনেক সময় সেটা সুবিধাজনক অবস্থান।

আমরা কি সত্যিই নিরপেক্ষ?
নাকি আমরা শুধু এমন একটা জায়গায় দাঁড়াই
যেখানে ঝুঁকি কম?

সবচেয়ে কঠিন কাজ পক্ষ নেওয়া না।
সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো—
সঠিক জায়গায় দাঁড়ানো।

নিরপেক্ষতা যদি সত্য খোঁজার প্রক্রিয়া হয়,
তাহলে সেটা সাহসী।

কিন্তু নিরপেক্ষতা যদি হয়
দায় এড়ানোর উপায়,
তাহলে সেটা নির্দোষ না।

শেষ প্রশ্নটা তোমার জন্য—

তুমি যখন চুপ থাকো,
তুমি কি শান্ত?
নাকি শুধু নিরাপদ?

যুদ্ধের খবর যত বাড়ে, আমাদের মানবিকতা কি তত কমে?

একটা সময় যুদ্ধ মানে ছিল আতঙ্ক।
এখন যুদ্ধ মানে নোটিফিকেশন।

স্ক্রিনে ভেসে ওঠে—
বিস্ফোরণ, হামলা, প্রতিশোধ, পাল্টা আক্রমণ।
আমরা দেখি। শেয়ার করি। তর্ক করি।
তারপর স্ক্রল করে আরেকটা ভিডিওতে চলে যাই।

যুদ্ধ থামে না।
শুধু আমাদের মন থেমে যায়।

প্রতিদিন এত খবর আসে যে কষ্টেরও যেন একটা সীমা আছে।
একসময় মানুষ মরার খবর শুনে আমরা থমকে যেতাম।
এখন সংখ্যাটা বড় হলে অবাক হই, ছোট হলে গুরুত্ব দিই না।

১০ জন?
৫০ জন?
৫০০ জন?

সংখ্যা বাড়ে, অনুভূতি কমে।

আমরা হয়তো খারাপ না।
আমরা ক্লান্ত।

একটা সময় ছিল যখন দূরের দেশের যুদ্ধ মানে ছিল দূরের ট্র্যাজেডি।
এখন সেটা আমাদের নিউজফিডে ঢুকে পড়ে।
কিন্তু সমস্যা হলো—
নিউজফিডে যা আসে, সেটা বেশিক্ষণ থাকে না।

আমাদের সহানুভূতিও কি এখন অ্যালগরিদম-নির্ভর?

যে খবর বেশি শেয়ার হয়, সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
যে ভিডিও বেশি ভাইরাল, সেই কষ্ট যেন বেশি বাস্তব।

বাকি কষ্টগুলো কোথায় যায়?

আমরা পক্ষ নিই।
তর্ক করি।
যুক্তি দিই।

কিন্তু খুব কম সময়ই আমরা থেমে ভাবি—
ওপারের মানুষটা আসলে কে ছিল?

কারও ছেলে।
কারও বাবা।
কারও অসমাপ্ত স্বপ্ন।

যুদ্ধের রাজনীতি বড়।
কিন্তু মৃত্যুগুলো সব সময় ব্যক্তিগত।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা হলো
আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাই।

বিস্ফোরণের শব্দ না শুনেও,
আমরা ভেতরে ভেতরে অসাড় হয়ে যাই।

হয়তো আমাদের মানবিকতা পুরোপুরি কমে যায় না।
কিন্তু সেটা প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়।

যুদ্ধের আগুন দূরে জ্বলে।
তার ছাই আমাদের মনেও পড়ে।

আজ যদি আমরা শুধু পক্ষ না নিয়ে
একবার মানুষের দিকে তাকাই—
তাহলে হয়তো যুদ্ধের ভেতর থেকেও
মানবিকতা বাঁচানো যায়।

শেষ প্রশ্নটা তোমার জন্য—

আমরা কি যুদ্ধের খবর দেখছি,
নাকি ধীরে ধীরে অনুভব করার ক্ষমতাটা হারাচ্ছি?

মিডিয়া কি আমাদের আবেগ বিক্রি করছে?

বাংলাদেশের মিডিয়া ও মিডিয়াকর্মী যারা আছে তারা এমন সুন্দর করে নিউজ উপস্থাপন করছে যেন ইরানই যুদ্ধের সর্বদিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। আমাদের আবেগ ও উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে ভিউ ব্যাবসা করা হলো তাদের ধান্দা। এই মুহূর্তে চরম বাস্তবতা হলো আজ ইরান ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে গত হচ্ছে। মোসাদের সাহায্যে ইরানের মাটিতে নেমে অপারেশন চালাচ্ছে মার্কিন ইসরায়েলের যৌর্থ বাহিনী।

আয়াতুল্লাহ খোমেনি হত্যার পর ইরান একতরফা মার্কিন ঘাটি গুলোতে লাগাতার আক্রমণ করলেও তেমন কোনো ভাসমান ক্ষতি করতে পারেনি। কিন্তু ইসরায়েল আমেরিকার যৌথ বাহিনী ইরানের অর্থনৈতিক অঞ্চল, পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংস করে দিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের আইআরজিসি ও বিভিন্ন ফোর্স প্রধানদের হত্যা করার মিশন চলমান রেখেছে।

এদেশের সব মিডিয়া গধি মিডিয়ার আচরণ করে। তাদের ভিউ ব্যাবসায় হলো মুখ্য। যেকোনো ইস্যুকে মনগড়াভাবে সাজিয়ে হাইলাইট করছে আপনার মনের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বেশি ভিউ পাবার জন্য। ভিউ হলেই ডলার।