Logo

মিডিয়া কি আমাদের আবেগ বিক্রি করছে?

বাংলাদেশের মিডিয়া ও মিডিয়াকর্মী যারা আছে তারা এমন সুন্দর করে নিউজ উপস্থাপন করছে যেন ইরানই যুদ্ধের সর্বদিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। আমাদের আবেগ ও উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে ভিউ ব্যাবসা করা হলো তাদের ধান্দা। এই মুহূর্তে চরম বাস্তবতা হলো আজ ইরান ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে গত হচ্ছে। মোসাদের সাহায্যে ইরানের মাটিতে নেমে অপারেশন চালাচ্ছে মার্কিন ইসরায়েলের যৌর্থ বাহিনী।

আয়াতুল্লাহ খোমেনি হত্যার পর ইরান একতরফা মার্কিন ঘাটি গুলোতে লাগাতার আক্রমণ করলেও তেমন কোনো ভাসমান ক্ষতি করতে পারেনি। কিন্তু ইসরায়েল আমেরিকার যৌথ বাহিনী ইরানের অর্থনৈতিক অঞ্চল, পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংস করে দিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের আইআরজিসি ও বিভিন্ন ফোর্স প্রধানদের হত্যা করার মিশন চলমান রেখেছে।

এদেশের সব মিডিয়া গধি মিডিয়ার আচরণ করে। তাদের ভিউ ব্যাবসায় হলো মুখ্য। যেকোনো ইস্যুকে মনগড়াভাবে সাজিয়ে হাইলাইট করছে আপনার মনের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বেশি ভিউ পাবার জন্য। ভিউ হলেই ডলার।

নতুন বই: অস্তিত্বের সংকট

Rakibul Hasan Shawon

অস্তিত্বের সংকট

ইতিহাস সব সময় শক্তদের পক্ষে লেখা হয়

ইতিহাস কখনো নিরপেক্ষ ছিল না।
সে সবসময় ক্ষমতার টেবিলের পাশেই বসেছে।
যার হাতে তলোয়ার ছিল,
কলমটাও শেষ পর্যন্ত তার হাতেই গেছে।

জয়ীরা ইতিহাস লেখে—এটা কোনো অভিযোগ না, এটা নিয়ম।
কারণ হারারা ব্যস্ত থাকে কবর গুনতে,
আর বিজয়ীরা ব্যস্ত থাকে গল্প বানাতে।

ইতিহাস বলে—কে দেশ “উদ্ধার” করল।
বলে না—কাদের ঘর পুড়ল।
ইতিহাস বলে—কে শত্রুকে “শাস্তি” দিল।
বলে না—কারা “উদাহরণ” হয়ে মরল।

যে দখল করে, সে বলে “একত্রীকরণ”।
যে প্রতিরোধ করে, সে হয়ে যায় “বিদ্রোহী”।
একই রক্ত,
শব্দ বদলালেই অর্থ বদলায়।

শক্তরা শুধু যুদ্ধ জেতে না—
তারা ভাষাও দখল করে।
“শান্তি অভিযান”, “প্রতিরক্ষামূলক হামলা”, “কোল্যাটারাল ড্যামেজ”—
এগুলো শব্দ না, এগুলো ঢাল।
এই ঢালের আড়ালেই লাশগুলো অদৃশ্য হয়।

হারারা ইতিহাসে থাকে ফুটনোটে—
নাম ছাড়া, মুখ ছাড়া।
কখনো “অজানা নিহত”,
কখনো “অনিবার্য ক্ষতি”।

ম্যাকিয়াভেলি হলে হয়তো বলতেন—
ক্ষমতা শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করে না,
সে অতীতও সম্পাদনা করে।
আর যে অতীত নিয়ন্ত্রণ করে,
সে মানুষকে শেখায়—কী ভুলে যেতে হবে।

তাই ইতিহাস পড়া মানে সত্য জানা না।
ইতিহাস পড়া মানে বোঝা—
কে বলছে,
কেন বলছে,
আর কাদের কথা ইচ্ছা করে বাদ রাখা হয়েছে।

ইতিহাস সব সময় শক্তদের পক্ষে লেখা হয়।
সত্য টিকে থাকে—
শুধু যারা খুঁজতে জানে, তাদের জন্য।

ভাল মানুষ হওয়া কঠিন না, ধারাবাহিক হওয়াই কঠিন

ভাল মানুষ হওয়া আসলে কঠিন কিছু না।
একটা দিনে দয়া করা যায়,
একটা মুহূর্তে সত্য বলা যায়,
একবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায়।

কঠিনটা শুরু হয় পরের দিন

ধারাবাহিকতা মানে প্রতিদিন একই নৈতিক ওজন বইতে রাজি থাকা—
যখন কেউ দেখছে না,
যখন লাভ নেই,
যখন ক্ষতি নিশ্চিত।

ভাল হওয়া অনেক সময় ইমেজ
ধারাবাহিক হওয়া সবসময় মূল্য

ভাল মানুষ হওয়া উৎসবে হয়—
ক্যামেরা থাকে, হাততালি থাকে, গল্প হয়।
ধারাবাহিকতা হয় নীরবে—
কোনো সাক্ষী নেই, কোনো শিরোনাম নেই।

ভাল মানুষ হওয়া সহজ, কারণ সেটা বেছে নেওয়া যায় সুবিধামতো।
ধারাবাহিক হওয়া কঠিন, কারণ সেটা বেছে নেওয়া যায় না—
ওটা তোমাকে ধরে রাখে,
তোমার সুবিধার বিরুদ্ধেও।

আজ যে নীতির পক্ষে কথা বললে,
কাল সেটাই তোমার ক্ষতি করলে—
তখনই পরীক্ষা।
সেই জায়গায় বেশিরভাগ “ভাল মানুষ” হারিয়ে যায়।

ম্যাকিয়াভেলিয়ান দৃষ্টিতে বললে—
মানুষ নৈতিকতার প্রেমে পড়ে,
কিন্তু প্রতিশ্রুতির সাথে থাকতে চায় না।
কারণ প্রতিশ্রুতি ক্ষমতা চায় না—
চায় চরিত্র।

ভাল মানুষ হওয়া মানে আলোতে দাঁড়ানো।
ধারাবাহিক হওয়া মানে অন্ধকারেও একই থাকা।

তাই হ্যাঁ—
ভাল মানুষ হওয়া কঠিন না।
কিন্তু প্রতিদিন, প্রতিবার, প্রতিকূলতায়ও
একই মানুষ থাকা—
ওটাই আসল যুদ্ধ।

আমরা কেন পড়া ছেড়ে দিই, কিন্তু স্ক্রল করা ছাড়ি না

আমরা বলি “সময় পাই না।”
মিথ্যে।
সময় আছে বলেই আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করি।
আসলে আমরা পড়া ছেড়ে দিই, কারণ পড়া মানুষকে বদলায়;
আর স্ক্রল ছাড়ি না, কারণ স্ক্রল মানুষকে শান্তভাবে নিষ্ক্রিয় রাখে।

পড়া চায় পরিশ্রম
স্ক্রল চায় শুধু আঙুল।
পড়া প্রশ্ন তোলে “আমি কি ঠিক ভাবছি?”
স্ক্রল বলে “চিন্তা কোরো না, পরেরটা দেখো।”

পড়া মানুষকে একা করে।
একটা বইয়ের সাথে বসে থাকলে, নিজের মাথার শব্দ শোনা যায়।
আর মানুষ নিজের মাথার শব্দ সহ্য করতে পারে না।
স্ক্রল সেই শব্দ ঢেকে দেয়—নোটিফিকেশন, রিল, ট্রেন্ড, ক্ষোভ, হাসি।
সবকিছু, শুধু নিজেকে ছাড়া

পড়া তোমাকে ধীর করে
আর এই যুগ ধীর মানুষ চায় না।
ধীর মানুষ ভাবতে শেখে,
ভাবতে শেখা মানুষ প্রশ্ন করে,
আর প্রশ্ন করা মানুষ শাসনের জন্য বিপজ্জনক।

স্ক্রল তোমাকে দ্রুত রাখে কিন্তু ফাঁকা
এক মিনিটে দশটা মতামত,
কিন্তু একটারও দায় নেই।
এটা ক্ষমতার জন্য আদর্শ নাগরিক—
সব জানে মনে করে,
কিন্তু কিছুই গভীরে জানে না।

পড়া তোমাকে শেখায়—সব কিছু সহজ নয়।
স্ক্রল শেখায়—সব কিছুর একটা হট টেক আছে।
পড়া তোমাকে ধৈর্য দেয়।
স্ক্রল তোমাকে উত্তেজনা দেয়।
রাষ্ট্র, বাজার, অ্যালগরিদম—সবাই জানে
উত্তেজিত মানুষ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ,
ধৈর্যশীল মানুষ নয়।

আমরা পড়া ছেড়ে দিই, কারণ পড়লে বুঝে যাই—
আমাদের অনেক বিশ্বাস ধার করা,
অনেক মতামত প্রস্তুত-প্যাকেট।
আর এই উপলব্ধি অস্বস্তিকর।

স্ক্রল সেই অস্বস্তি দেয় না।
স্ক্রল শুধু বলে “তুমি ঠিক আছো। সমস্যা অন্যদের।”

ম্যাকিয়াভেলি হলে হয়তো বলতেন—
যে সমাজ পড়া ছেড়ে দেয়,
সে সমাজ শিকল পরে না—
সে নিজেই শিকলটাকে স্বস্তি বলে মেনে নেয়।

আমরা বই বন্ধ করি,
কারণ বই আয়না।
আর আমরা স্ক্রল চালু রাখি,
কারণ স্ক্রল পর্দা।

একটা তোমাকে মানুষ বানায়।
আরেকটা তোমাকে ব্যস্ত রাখে—
যাতে মানুষ হয়ে উঠার সময়ই না থাকে।

যুদ্ধের সময় মানুষ কী হারায়—যা খবরের শিরোনামে আসে না

যুদ্ধের খবর আমরা পড়ি সংখ্যায়—
কতজন নিহত, কতটা এলাকা দখল, কত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি।
কিন্তু যুদ্ধ আসলে সংখ্যার খেলা নয়। যুদ্ধ হলো ক্ষমতার হিসাব, আর সেই হিসাবের খাতায় মানুষ কেবল ব্যয়যোগ্য সম্পদ

খবরের শিরোনাম বলে না—
যুদ্ধের প্রথম শিকার সত্য
প্রতিটি পক্ষ নিজের বোমাকে “প্রতিরক্ষা” বলে, অন্যের কান্নাকে “প্রপাগান্ডা” বলে। সত্য এখানে বিলাসিতা—যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র সত্য বহন করে না, ব্যবহার করে।

খবরের শিরোনাম বলে না—
মানুষ তার নৈতিকতা হারায় ধীরে ধীরে
প্রথমে শত্রু মানুষ থাকে, তারপর “টার্গেট”, শেষে “সংখ্যা”।
যে মানুষ কাল পর্যন্ত বলত “নিরীহদের হত্যা অন্যায়”, সে আজ বলে—
“যুদ্ধ হলে একটু কোল্যাটারাল ড্যামেজ হতেই পারে।”
নৈতিকতা মারা যায় না—রাষ্ট্র তাকে প্রয়োজনমতো ছুটি দেয়।

খবরের শিরোনাম বলে না—
যুদ্ধ মানুষের সহানুভূতিকে জাতীয়তা দিয়ে ভাগ করে দেয়
আমাদের শিশু = শহীদ
ওদের শিশু = পার্শ্বক্ষতি
কান্নার ভাষা এক, কিন্তু পতাকা আলাদা হলে মূল্যও আলাদা।

খবরের শিরোনাম বলে না—
যুদ্ধ মানুষকে চিন্তা করতে ভয় শেখায়
প্রশ্ন করা দেশদ্রোহিতা হয়ে যায়, সন্দেহ মানেই শত্রুর দালাল।
রাষ্ট্র তখন চায় আনুগত্য, বুদ্ধি নয়।
কারণ ভাবতে জানা মানুষ শাসনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।

খবরের শিরোনাম বলে না—
যুদ্ধ মানুষকে অভ্যাসে নিষ্ঠুর করে তোলে
প্রথম লাশে শিউরে ওঠা মানুষ, দশম লাশে চা খেতে খেতে স্ক্রল করে।
নিষ্ঠুরতা জন্মায় না—বারবার দেখলে সেটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।

খবরের শিরোনাম বলে না—
যুদ্ধ শেষে যারা বেঁচে থাকে, তারা আর আগের মানুষ থাকে না।
তারা ঘরে ফেরে ঠিকই, কিন্তু
বিশ্বাস ফেরে না,
নিরাপত্তা ফেরে না,
আর সবচেয়ে ভয়ংকর—ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতা ফেরে না।

ম্যাকিয়াভেলি হলে হয়তো বলতেন—
রাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু রাষ্ট্র যদি ভুলে যায়, যুদ্ধের আসল দাম মানুষ দেয়—
তাহলে সেই রাষ্ট্র টিকে থাকে ঠিকই,
কিন্তু মানুষের জন্য নয়,
মানুষকে ব্যবহার করার জন্য।

যুদ্ধ শেষে মানচিত্র বদলায়।
কিন্তু নীরবে যা বদলায়—
মানুষের ভেতরের মানুষটা—
ওটার কোনো হেডলাইন হয় না।